কাদিয়ানি ধর্ম ও সংখ্যালঘু অধিকার
[২৯ নভেম্বর ২০২৪ ঈ.]
ইন্টারন্যাশনাল খতমে নবুওয়ত মুভমেন্ট
আয়োজিত সেমিনারে উপস্থাপিত
প্রবন্ধ
সংকলন ও উপস্থাপনায়
মুফতী শুয়াইব ইবরাহীম
আমির- ইন্টারন্যাশনাল খতমে নবুওয়ত মুভমেন্ট, বাংলাদেশ
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক- খতমে নবুওয়ত মারকায বাংলাদেশ
কাদিয়ানি ধর্ম ও সংখ্যালঘু অধিকার
উপস্থিত সম্মানিত উলামায়ে কেরাম, মাশায়েখে এজাম ও সুধীবৃন্দ!
গোটা মানব জাতির হেদায়েত, নাজাত ও দুনিয়া আখেরাতের কামিয়াবির জন্য আল্লাহ তাআলা কর্তৃক প্রদত্ত একমাত্র ধর্ম ইসলাম। ইসলামই আল্লাহ তাআলার মনোনীত পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। মানব জাতির ইহকালীন শান্তি এবং পরকালীন মুক্তির একমাত্র উপায় ইসলামের অনুসরণ। ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম আল্লাহ তাআলার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মনোনীত ধর্ম ইসলাম।’ (সূরা আল-ইমরান: ১৯)
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন-
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ۚ
অর্থ: ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে সম্পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সূরা মায়েদা:৩)
আরও ইরশাদ হয়েছে- وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ: ‘আর যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন অবলম্বন করবে, তার থেকে সে দ্বীন কবুল করা হবে না এবং আখিরাতে সে মহা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সূরা আলে ইমরান: ৮৫)
ইসলামের বুনিয়াদ হলো মুখে ঈমানের কালিমা উচ্চারণ করা এবং যে সকল বিষয়ের ওপর ঈমান আনা অপরিহার্য তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করা। মুমিন হওয়ার জন্য যে সকল বিষয়ের ওপর ঈমান আনা অপরিহার্য তার মধ্যে রয়েছে আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব স্বীকার করা, তাঁকেই একমাত্র স্রষ্টা, রব ও মাবুদ বিশ্বাস করা এবং তার আসমায়ে হুসনা ও সিফাত বা গুণাবলিতে যথাযথ বিশ্বাস রাখা এবং কোন কিছুতেই তার সাথে শরীক সাব্যস্ত না করা। এছাড়াও আল্লাহ তাআলার ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান, আসমানী কিতাবের প্রতি ঈমান, আল্লাহ তাআলার প্রেরিত নবী রাসুলদের প্রতি ঈমান এবং তাকদীর, আখেরাত, পুনরুত্থান এবং জান্নাত জাহান্নামের প্রতি যথাযথ বিশ্বাস স্থাপন করা ইসলামের অপরিহার্য মৌলিক বিষয়। মুমিন এবং মুসলিম হওয়ার জন্য এসকল বিষয়ের উপর ঈমান আনা ফরয। এগুলো হলো ইসলামের মূল ভিত্তি যার কোনো একটি ছাড়া মুমিন হওয়া যায় না। এগুলো মনে প্রাণে বিশ্বাস না করলে কারো ইসলাম সাব্যস্ত হবে না। অত:পর দ্বীন ইসলামের স্বত:সিদ্ধ, সর্বজনবিদিত ও যুগ পরম্পরায় প্রতিষ্ঠিত কোনো বিষয়কে অস্বীকার করা বা তাতে সন্দেহ প্রকাশ করা বা তার স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত অর্থের বিপরীত কোনো অর্থ করা ইসলাম থেকে খারিজ হওয়ার কারণ। এমন ব্যক্তির ইসলামে কোন স্থান নেই। মুসলিম হিসেবে নিজেকে দাবি করার কোনো অধিকার তার নেই।
খতমে নবুওয়ত আকীদা
রেসালতের প্রতি ঈমান তথা নবী রাসুলদের উপর বিশ্বাসের ক্ষেত্রে “খতমে নবুওয়তের বিশ্বাস” ইসলামের অন্যতম অপরিহার্য মৌলিক বিশ্বাস। এর অর্থ হল- মানব কল্যাণে আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ. এর মাধ্যমে পৃথিবীতে নবী প্রেরণের যে সূচনা করেছেন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাধ্যমে তা পরিসমাপ্ত করেছেন। মুহাম্মাদ সা. এর পর নতুন করে কেউ নবী হবে না। শরীয়তধারী কিংবা শরীয়তবিহীন কোনো প্রকারের নবুওয়ত কেউ লাভ করবে না। বরং সর্বদিক থেকে হযরত মুহাম্মাদ সা. সর্বশেষ নবী ও রাসুল। খতমে নবুওয়তের এই বিষয়টি কুরআনুল কারীমের শতাধিক আয়াত, দুই শতাধিক হাদীস এবং সাহাবায়ে কেরাম রা. থেকে সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত ইজমা’ দ্বারা প্রমাণিত। এটি ইসলামের এমন একটি আকীদা, যার ওপর ভিত্তি করেই ইসলাম কেয়ামত পর্যন্ত চিরন্তন হয়। পক্ষান্তরে নতুন কোনো নবীর আগমন স্বীকার করলে ইসলাম কেয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে না।
‘খতমে নবুওয়ত’ এর উপর্যুক্ত বিশ্বাসের সাথে আরও দুটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আসমানি কিতাব বা ওহী নাজিলের বিষয়টি বন্ধ হওয়া এবং আসমানী শরীয়ত বা ধর্ম চুড়ান্ত ও সমাপ্ত হওয়া। সুতরাং খতমে নবুওয়তের আলোচনায় তিনটি কথা স্মরণ রাখা কর্তব্য। যথা-
এক. নবী-রাসূলের ধারাবাহিকতায় হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদিক থেকে সর্বশেষ নবী; তাঁর পরে আর কেউ হবে না।
দুই. কুরআন মাজীদ সর্বশেষ আসমানী কিতাব; কোরআনের পরে আর কোনো ওহী/আসমানী কিতাব নাযিল হবে না।
তিন. আল্লাহ তাআলার কাছে গ্রগণযোগ্য, নাজাত ও মুক্তির একমাত্র ধর্ম ইসলাম; ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মে নাজাত বা মুক্তি মিলবে না। উল্লেখ্য, এই তিনটি বিষয়ের সবগুলোতেই কাদিয়ানি ধর্মের বিশ্বাস ইসলামী আকীদার সম্পূর্ণ বিপরীত।
কুরআন মাজীদ ও হাদীসের আলোকে খতমে নবুওয়ত
কুরআনুল কারীমের শতাধিক আয়াত এবং নবীজি সা. এর দুই শতাধিক হাদিস ভাণ্ডার থেকে সংক্ষিপ্ত এই কলেবরে নমুনা স্বরূপ কয়েকটি উদ্ধৃতি উপস্থাপন করছি-
এক. খতমে নবুওয়ত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতে-
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ
অর্থ: মুহাম্মদ তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নন, তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। (সূরা আহযাব, আয়াত-৪০
দুই. শেষ নবী সম্পর্কে সকল নবীদের থেকে আল্লাহ তাআলার নেওয়া প্রতিশ্রুতি-
وإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّن كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنصُرُنَّهُ ۚ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَىٰ ذَٰلِكُمْ إِصْرِي ۖ قَالُوا أَقْرَرْنَا ۚ قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ (৮১)
অর্থ: ‘আর স্মরণ করো যখন আল্লাহ তাআলা নবীগণের প্রতিশ্রুতি নিলেন (এই বলে) যে, আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করব। অতঃপর তোমাদের কাছে একজন রাসুল আসবেন, যিনি তোমাদের সাথে থাকা বিষয় (কিতাব) সত্যায়ন করবেন। তোমরা অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান রাখবে এবং তাঁকে অবশ্যই সাহায্য করবে। তিনি (আল্লাহ) বললেন: তোমরা কি স্বীকার করছো এবং এ বিষয়ে আমার পক্ষ হতে প্রদত্ত এ দায়িত্ব গস্খহণ করছো? তারা বলেছিলো- আমরা স্বীকার করছি। আল্লাহ বললেন- তাহলে তোমরা সাক্ষী থাকো এবং আমিও সাক্ষী থাকলাম।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ৮১) এই আয়াতে বর্ণিত ‘অতঃপর তোমাদের মাঝে একজন রাসুল আসবেন’ বলে সর্বসম্মতিক্রমে শেষ নবী হযর মুহাম্মাদ সা. কে বুঝানো হয়েছে।
তিন. হাদিসে পাকে রাসূল সা. হযরত আলী রা. কে খেুাব করে বলেছেন
عن سعد بن أبي وقاص رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لعلي : أنت مني بمنزلة هارون من موسى ، إلا أنه لا نبي بعدي . متفق عليه .
অর্থ: ‘হযরত সাআদ রা. থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রা. কে বলেছেন- তোমার অবস্থান আমার কাছে মুসা আ. এর কাছে হারুন আ. এর অবস্থানের মতো। তবে আমার পরে কোন নবী নেই।’ (সহীহ বুখারী ৪৪১৬, সহীহ মুসলিম, ২৪০৪।)
চার. হযরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন-
أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال: إن مثلي مثل الأنبياء من قبلي كمثل رجل بنى بيتا فأحسنه وأجمله إلا موضع لبنة من زاوية فجعل الناس يطوفون به ويعجبون له ويقولون هلا وضعت هذه اللبنة ؟ قال فأنا اللبنة وأنا خاتم النبيين
অর্থ: ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার এবং অন্যান্য নবীদের উপমা ঐ ব্যক্তির মতো যে একটি ঘর নির্মাণ করেছে এবং অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজসজ্জা করেছে। কিন্তু, একস্থানে একটি ইটের জায়গা খালি রেখে দিয়েছে। লোকেরা ঘুরেঘুরে দেখছে আর বিমুগ্ধ হয়ে বলছে, আহা! যদি ঐ ইটটি লাগিয়ে দেওয়া হতো তাহলে কতইনা সুন্দর দেখাতো! নবীজী বলেন, আমিই সেই ইট, আমিই সর্বশেষ নবী।’ (বুখারী/৩৩৪২)
ইজমা’ -এর আলোকে খতমে নবুওয়ত
ইসলামের পরিভাষায় ইজমা’ হল কোন বিষয়ে এই উম্মতের মুজতাহিদগণ একমত পোষণ করা। ইজমা’ শরীয়তের তৃতীয় দলিল। নবীজি সা. ইরশাদ করেছেন ‘আমার উম্মত গোমরাহীর উপরে একমত হবে না।’ আর সাহাবায়ে কেরামের ইজমা’ তো অকাট্য দলিল।
খতমে নবুওয়ত আকীদাটি সাহাবায়ে কেরামের যুগে প্রতিষ্ঠিত সর্বপ্রথম ইজমায়ী মাসআলা। সেই সোনালী যুগ থেকে আজ পর্যন্ত গোটা উম্মতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর কেউ যদি নবী হওয়ার দাবি করে তাহলে সে ভণ্ড, মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) ও কাফের।
নিম্নে খতমে নবুওয়ত বিষয়ে ইজমা’ এর কয়েকটি উদ্ধৃতি লক্ষ্য করুন:
এক. প্রখ্যাত মুহাদ্দিস মুল্লা আলী কারী রহ. (মৃত:১০১৪ হি.) লিখেছেন-
دعوى النُّبُوَّةِ بعد نبيِّنا صلَّى اللهُ عليه وسلَّم كُفرٌ بالإجماعِ
আমাদের নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর নবুওয়তের দাবি করা সর্বসম্মতিক্রমে কুফুরি। (শরহুল ফিকহিল আকবার: ৪৫১)
দুই. ইমাম ইবনে হাযম আন্দালুসী রহ. বলেন
وقد صح عن رسول الله الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم بِنَقْل الكواف الَّتِي نقلت نبوته واعلامه وَكتابه أَنه أخبر أَنه لَا نَبِي بعده إِلَّا مَا جَاءَت الْأَخْبَار الصِّحَاح من نزُول عِيسَى عَلَيْهِ السَّلَام الَّذِي بعث إِلَى بني إِسْرَائِيل
যে বিপুল পরিমাণ বর্ননাকারীর সূত্রে রাসূল সা. এর নবুওয়ত, তার মুজেযা এবং তার আনীত কিতাব (কুরআন কারীম) বর্নিত হয়েছে, এমন বিপুল পরিমাণ বর্ননা কারীর সূত্রেই একথা বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তাঁর পরে কোনো নবী নেই। এটা ভিন্ন বিষয় যে, বহু সহীহ হাদিসে একথা এসেছে যে, কিয়ামতের পূর্বে নবী ঈসা আ. আবার পৃথিবীতে আসবেন, যিনি (আমাদের নবীর পূর্বে) বনী ঈসরাঈলের নবী ছিলেন…। – আলফসল ফিলমিলালিওয়াল আহওয়াই ওয়ান নিহাল, ১/৬৭-৬৮
তিন. কাজী ইয়ায রহ. বলেন,
فهؤلاء كلهم كفار مكذبون للنبي – صلى الله عليه وسلم – ، لأنه أخبر – صلى الله عليه وسلم – أنه خاتم النبيين ، لا نبي بعده . وأخبر عن الله – تعالى – أنه خاتم النبيين ، وأنه أرسل كافة للناس .وأجمعت الأمة على حمل هذا الكلام على ظاهره ، وأن مفهومه المراد منه دون تأويل ، ولا تخصيص ، فلا شك في كفر هؤلاء الطوائف كلها قطعا إجماعا وسمعا .
সুতরাং তারা সকলেই কাফের এবং নবী সা. কে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। কেননা রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন তিনি সর্বশেষ নবী, তাঁর পরে কোনো নবী নেই। তিনি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেও এই সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি শেষ নবী এবং তাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে গোটা উম্মতের ইজমা ও ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত যে, নবী সা. খাতামুন্নাবিয়্যিন তথা শেষ নবী। একথাটি সম্পূর্ন স্বীয় বাহ্যিক অর্থের উপর প্রতিষ্ঠিত। স্বাভাবিকভাবে বাক্যের যে অর্থ বোঝা যায় এটাই তার উদ্দিষ্ট অর্থ। এখানে ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করানো কিংবা ওই বাক্যের ব্যাপকভাবে সংকুচিত করার কোনো সুযোগ নেই। সুতারাং উপরোক্ত দলগুলোর কাফের হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এটা কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বক্তব্য ও উম্মতের ঐক্যমত দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমানিত। (আশ-শিফা বিতারীফি হুকূকিল মুস্তফা, পৃ. ৩০৭)
সায়্যিদুনা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমানের ক্ষেত্রে অপরিহার্য বিষয় হল— এ কথা বিশ্বাস করা যে, তিনি বর্তমান সময়েরও নবী এবং তিনিই সর্র্বশেষ নবী ও রাসূল। যদি কেউ তাকে রাসুল বিশ্বাস করে কিন্তু তাকে সর্বশেষ রাসূল না মানে এবং তার আনীত ধর্মকে কিয়ামত পর্যন্ত বহাল বিশ্বাস না করে, তাহলে সে মুমিন নয়। (ফাতাওয়া বায্যাযিয়া: ৬/৩২৭)
কাদিয়ানি মতবাদ পরিচিতি
কাদিয়ানি মতবাদ কি? এ প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষেপে বলা যায়, মির্যা কাদিয়ানি নিজের ব্যাপারে যেসব ভ্রান্ত ও অবাস্তব দাবি উত্থাপন করেছেন এবং ধর্ম বিকৃতির পথ ধরে যেসব কুফুরি আকীদা ও মতবাদকে নিজের ধারণা অনুপাতে সহীহ ইসলামী আকীদা বলে প্রচার করেছেন এরই নাম কাদিয়ানি মতবাদ।
কুরআন মাজীদের শতাধিক আয়াত ও দুই শতাধিক হাদিসের আলোকে প্রমাণিত সর্বসম্মত ইসলামী আকীদা ‘খতমে নবুওয়ত’ এর অপব্যাখ্যা ও অস্বীকার, নবুওয়ত ও ওহী প্রাপ্তির দাবির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ, নবীজি সা. এর পূনর্জন্মের মতবাদ আবিদস্কার করে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি নিজেকে ছায়া মুহাম্মাদ ও স্বয়ং মুহাম্মদ দাবি করার ধৃষ্টতা প্রদর্শন, হযরত ঈসা আ. কে মৃত সাব্যস্ত করে এতদসংশ্লিষ্ট কুরআন শরীফের ত্রিশটি আয়াতের অপব্যাখ্যা এবং নবী রাসুল ও ইসলামের সম্মানিত নিদর্শনাবলির প্রতি অসম্মান ও গোস্তাখী করাসহ ইসলামের অগণিত বিষয়ে মনগড়া মতবাদ দাঁড় করিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক একটি স্বতন্ত্র ধর্ম আবিস্কার করতঃ উল্টো তাকেই প্রকৃত ইসলাম (!) আখ্যায়িত করার নাম কাদিয়ানি মতবাদ।
কাদিয়ানিদের অগণিত কুফুরি মতবাদের মধ্যে মির্যা কাদিয়ানির অবাস্তব ও অবান্তর দাবিগুলো সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। কেননা মির্যা কাদিয়ানির ছেলে মির্যা বশীর আহমদ এম এ লিখেছেন-
“আহমদিয়াতের নিজস্ব অজিফার আলোচনায় প্রতিশ্রুত মাসীহের দাবিগুলোর অবস্থান সর্বাগ্রে। কেননা আহমদী ইমারতের ভিত্তি এই দাবিগুলোর উপরই প্রতিষ্ঠিত।” (হাকীকী ইসলাম- পৃ: ২৫, লেখক: মির্যা বশীর আহমাদ এম এ)
কাদিয়ানিদের কয়েকটি কুফুরি আকীদা
কাদিয়ানি আকীদা-১. মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানির নবী দাবি
কাদিয়ানি জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি নিজেকে নবী ও রসূল তথা শরীয়ত বিহীন এবং শরীয়তধারী উভয় প্রকার নবী হওয়ার দাবি করেছেন। নীচের রেফারেন্সগুলো লক্ষ করুন:
(ক) “কয়েকদিন হল, এরূপ এক ব্যক্তির নিকটে কোন বিরুদ্ধবাদী আপত্তি জানায় যে, তুমি যার নিকট বয়াত (শিষ্যত্ব গ্রহণ) করেছো, তিনি নবী ও রসূল হবার দাবি করেছেন। এর উত্তর শুধু অস্বীকারজ্ঞাপক শব্দে দেয়া হয়েছিল। অথচ এরূপ উত্তর সঠিক নয়। সত্য কথা এই যে, আমার প্রতি অবতীর্ণ আল্লাহ্র পবিত্র ওহী (বাণী) সমূহে নবী, রসূল ও মুরসাল শ্রেণীর শব্দ একবার দু’বার নয়, শত শত বার বিদ্যমান রয়েছে।” (এক গলতি কা ইযালা পুস্তিকার বাংলা অনুবাদএকটি ভুল সংশোধন-পৃ:-১)
(খ) একই পৃষ্ঠায় একটু অগ্রসর হয়ে লিখেছেন: “হুয়াল্লাযী আরসালা রসূলাহু বিল হুদা” এতে স্পষ্টভাবে আমাকে রসূল বলা হয়েছে।” (পৃ: ১)
(গ) একই পুস্তিকার ২য় পৃষ্ঠায় লিখেছেন: ‘দুনিয়া মে এক নবী আয়া’- অর্থাৎ “পৃথিবীতে একজন নবী এসেছেন।” (পৃষ্ঠা-২)
(ঘ) একই পুস্তিকার ৮ম পৃষ্ঠায় লিখেছেন: “স্বয়ং খোদাতাআলা যখন আমকে নবী ও রসূল আখ্যা দিয়েছেন, তখন আমি কীরূপে এটা প্রত্যাখ্যান করতে পারি? (পৃ: ৬)
কাদিয়ানি আকীদা-২. মির্যা কাদিয়ানি নিজেই মুহাম্মাদ হওয়ার দাবি
(ক) মির্যা কাদিয়ানি লিখেছেন:
“আবার এ পুস্তকেই উক্ত ওহির সাথে আল্লাহর এই ওহি আছে- محمد رسول الله والذين معه أشداء على الكفار এ ঐশী বানীতে আমার নাম মুহাম্মাদ রাখা হয়েছে এবং রাসুলও”। (একটি ভুল সংশোধন পৃ: ২)
(খ) আমি বার বার বলেছি যে- وَأَخَرِيْنَ مِنْهُمْ لَمَّا يَلْحَقُوا بِهِمُ আয়াতানুযায়ী আমি বুরুযীভাবে সেই খাতামুল আম্বিয়া এবং খোদা আজ হতে বিশ বছর পূর্বে বারাহীনে আহমদীয়া (নামক পুস্তকে) আমার নাম মুহাম্মদ (সা.) ও আহমদ (সা.) রেখেছেন এবং আমাকে মহানবী (সা.)-এরই সত্তা নির্ধারিত করেছেন। সুতরাং এভাবে আমার নবুওয়তের দ্বারা মহানবী (সা.)- এর খাতামুল আম্বিয়ার মর্যাদায় কোন ধাক্কা লাগে নি। কারণ ছায়া আপন মূল সত্তা হতে পৃথক নয়। যেহেতু আমি প্রতিবিম্বস্বরূপ মুহাম্মদ (সা.), সুতরাং এ প্রকারে খাতামান্নাবীঈনের মোহর ভাঙ্গে নি। কারণ মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়ত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। (একটি ভুল সংশোধন পৃ: ৮)
(গ) বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মির্যা কাদিয়ানির ছেলে মির্যা বশীর আহমদ এম এ লিাখেছেন-
‘আমাদের নতুন কালিমার প্রয়োজন নেই, কেননা মাসিহে মাওউদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আলাদা কেউ নন । তিনি বলেন, ‘আমার অস্তিত্বই তার অস্তিত্ব’। আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ও মুস্তফার মাঝে পার্থক্য করে, সে আমাকে চেনেনি, আমাকে দেখেনি।’ এই পার্থক্যটা না থাকার কারণ হলো আল্লাহর ওয়াদা ছিল- তিনি খাতামুন্নাবিয়্যীনকে আবার দুনিয়াতে পাঠাবেন। সুতরাং মাসিহে মাওউদই স্বয়ং মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ। তাই আমাদের নতুন কালিমার প্রয়োজন নেই । হ্যাঁ, মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহর স্থানে অন্য কেউ হলে নতুন কালিমার প্রয়োজন হতো।’ (কালিমাতুল ফসল, পৃষ্ঠা-১৫৮)
উল্লেখ্য, এর অর্থ হল- কালিমা পাঠ করে কোন মুসলমান যখন বলে- ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’, তখন মুসলমানদের উেেদ্দশ্য থাকে আরবের দুলাল খাজা আবদুল্লাহর ঔরশে ও আমেনার গর্ভে জন্ম নেওয়া আল্লাহ তাআলার প্রেরিত শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পক্ষান্তরে কাদিয়ানিরা একই কালিমা পাঠ করে ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ বলে উদ্দেশ্য করে মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানিকে। কালিমার শব্দ এক, অর্থ ভিন্ন।
কাদিয়ানি আকীদা-৩. যে ব্যক্তি মির্যা কাদিয়ানির প্রতি ঈমান রাখে না সে কাফের ও জাহান্নামী
(ক) মির্যার কথিত ইলহাম- ‘যে ব্যক্তি তোমার অনুসরণ করবে না, তোমার হাতে বাইয়াত হবে না; বরং তোমার বিরোধী থাকবে, সে আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্য এবং জাহান্নামী।’ (১৮৯৯ সাল, মির্যা কাদিয়ানির (কথিত) ওহীর সংকলন, তাযকিরাহ, ৪র্থ সংস্করণ পৃষ্ঠা ২৮০)
(খ) মির্যা মাহমুদ বলেন, ‘যেসব মুসলমান প্রতিশ্রুত মাসীহের বাইয়াতে শামিল হবে না, যদিও সে মাসীহের নাম না শুনে থাকে তারপরও সে কাফের এবং ইসলামের গণ্ডি বহির্ভূত।’ (আয়েনায়ে সাদাকাত ৩৫, মির্যা মাহমুদ রচিত)
কাদিয়ানি আকীদা- ৪. মির্যার কল্পনাপ্রসূত ইলহাম কুরআনের মতো অকাট্য ও বিশ্বাসযোগ্য
মির্যা কাদিয়ানি লিখেছেন- ‘আল্লাহর কসম খেয়ে বলি, আমি এসব ইলহামের প্রতি সেরূপ ঈমান পোষণ করি যেরূপ ঈমান পোষণ করি কুরআন ও আল্লাহর অন্যান্য কিতাবের প্রতি। কুরআনকে যেমন নিশ্চিত ও অকাট্যরূপে আল্লাহর কালাম মনে করি, তদ্রুপ সেই ইলহামকেও আল্লাহর কালাম বলে বিশ্বাস করি যা আমার উপর নাযিল হয়।’ (হাকিকতুল ওহী-২১১, রুহানি খাযায়েন-২২/২২০)
কাদিয়ানি আকীদা- ৫. হযরতঈসা আ. কে জীবিত বিশ্বাস করা মহা শিরক
মির্যা সাহেব লিখেন- ‘ঈসা আ. মৃত্যুবরণ করেননি’ একথা বলা বে-আদবী ও মহাশিরক, যা নেক আমলকে খেয়ে ফেলে এবং তা আকল বিরোধী কথা।” (যমীমায়ে হাকিকাতুল ওহী, রুহানী খাযায়েন-২২/৬৬০)
দৃষ্টি আকর্ষণ! অথচ ইসলামের বিশ্বাসমতে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার প্রেরিত একজন মহিমান্বিত নবী ও রাসূল। আল্লাহ তাআলা তাকে বিশেষ কুুদরতে সৃষ্টি করেছেন এবং অনন্ন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মু’জিযা দান করেছেন। অতঃপর তিনি ইহুদিদের দ্বারা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ইহুদীরা তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র চুড়ান্ত করেছিল। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী ইহুদিরা তাদের ষড়যন্ত্রের সফল হতে পারেনি। বরং আল্লাহতালা তাকে ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচিয়ে জীবিত অবস্থায় আসমানে তুলে নিয়েছেন। তাকে শেষ জামানায় আবার দুনিয়াতে প্রেরণ করা হবে এবং তিনি শেষ জামানায় এসে শেষ নবীর উম্মতদের নেতৃত্ব দিয়ে দুনিয়ার বুকে শান্তি শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। এ বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে কোরআনের বর্ণনায় এবং সহীহ হাদিসে বর্ণিত রয়েছে। মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি এক সময় তার লিখনীতে এ বিষয়গুলো স্বীকার করতেন। পরবর্তীতে তিনি হযরত ঈসা আ. এর শানে জঘন্য কটুক্তি করেছেন। তাকে ও তার মা নানিদের নিয়ে জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত সাব্যস্ত করেছেন। কাদিয়ানি জামাতের পক্ষ থেকে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের মৃত্যু প্রমাণ করার জন্য স্বতন্ত্র একটি পুস্তিকার মাধ্যমে কোরআনের ৩০ টি আয়াতের অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। এভাবেই মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে গালিগালাজ করে মৃত সাব্যস্ত করে অতঃপর তিনি নিজেই ঈসা মসীহ হওয়ার দাবি করেছেন।
কাদিয়ানি আকীদা- ৬. মির্যা গোলাম কাদিয়ানি নিজেই ঈসা মাসীহ হওয়ার দাবি
মির্যা সাহেব লিখেন- ‘আমি ঐ ব্যক্তি, যার রুহে বুরুজিভাবে ইসা মাসিহের রুহ গচ্ছিত রাখা হয়েছে।’ (তোহফায়ে কাইসারিয়া, পৃষ্ঠা-২১, রুহানি খাযায়েন ১২/২৭৩)
‘আল্লাহ তায়ালা আমার নাম রেখেছেন প্রতিশ্রুত মাসিহ, অর্থাৎ এমন ব্যক্তি, যিনি ঈসা মাসিহের স্বভাব-চরিত্রের অনুরূপ।’ (কাশফুল গিতা, পৃষ্ঠা-১৬, রুহানি খাযায়েন ১৪/১৯২)
‘আল্লাহ আমাকে মাসিহে মাওউদ বানিয়ে পাঠিয়েছেন এবং ঈসা ইবনে মারইয়ামের জামা আমাকে পরিয়ে দিয়েছেন।’ (গভর্নমেন্ট আংরেজি আওর জিহাদ, পৃষ্ঠা-১৪, রুহানি খাযায়েন ১৭/১৪)
‘ঈসা মাসিহর অবতরণের প্রচণ্ড প্রয়োজন ছিল। সুতরাং আমিই সেই অবতার, যাকে ঈসা মাসিহের আকৃতি প্রকৃতি দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে।’ (রিসালায়ে যমিমায়ে জিহাদ, পৃষ্ঠা-৪, রুহানি খাযায়েন ১৭/২৬)
কাদিয়ানি আকীদা- ৭. কাদিয়ানের বার্ষিক মাহফিল আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত ছায়া হজ্জ
(ক) মির্যা কাদিয়ানি লিখেন- ‘সাধারণ লোকেরা নফল হজ্জ করার জন্য যায়। অথচ এই জায়গায় (কাদিয়ান) নফল হজ্জ থেকেও বেশি ছওয়াব রয়েছে। উদাসিনতায় ক্ষতি ও আশঙ্কা রয়েছে। কেননা এ ধারা আসমানী, হুকমে রব্বানী। (আইনায়ে কামালাতে ইসলাম, রুহানি খাযায়েন-৫/৩৫২)
(খ) মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমূদ এক আলোচনায় বলেন- ‘যারা ধনী ও সক্ষম তারাই হজ্জে যেতে পারে। অথচ ঐশী আন্দোলন প্রথমে দরিদ্রদের মাঝেই প্রসারিত হয় এবং উন্নতি লাভ করে। আর দরিদ্রদের জন্য হজ্জ আবশ্যক নয়। তাই আল্লাহ তাআলা একটি যিল্লি হজ্জ নির্দিষ্ট করেছেন। যাদের দ্বারা তিনি ইসলামের উন্নতির কাজ নেবেন এবং যারা দরিদ্র অর্থাৎ হিন্দুস্তানি মুসলমান তারা যেন হজ্জে শামিল হতে পারে।’ (খুতবায়ে মির্যা মাহমূদ আহমাদ কাদিয়ানি, আল ফজল কাদিয়ান পহেলা ডিসেম্বর ১৯১৪ ইং. সূত্র: কাদিয়ানি মাযহাব, পৃ- ৪৫৫) ১৯১৪ সালের বাৎসরিক মাহফিলে মির্যা মাহমূদ বলেন- “আজ মাহফিলের প্রথম দিন, আমাদের মাহফিলও হজ্জের মত।” (সূত্র কাদিয়ানি মাযহাব, পৃ- ৪৫৫)
সারকথা, কাদিয়ানি ধর্মের অগণিত কুফুরি মতবাদের মধ্য থেকে নমুনাস্বরূপ কয়েকটি কুফুরি বিশ্বাস তাদের বইয়ের রেফারেন্সসহ এখানে উল্লেখ করা হলো। এছাড়াও হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে জঘন্য কটুক্তি, অন্যান্য নবীদের শানে গোস্তাখি, ইসলামের ফরজ হুকুম জিহাদের বিধান রহিত করা, নিজেকে ইমাম মাহদী দাবি করা, ইমাম মাহদী ও ঈসা আ. দুজনকে একই ব্যক্তি দাবি করাসহ আরও অনেক কুফুরি মতবাদ আবিষ্কার করেছেন মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি। তার অনুসারী কাদিয়ানি জামাত সে সকল মতবাদকে নিজেদের ধর্মবিশ্বাস হিসেবেই বিশ্বাস করে। শুধু তাই নয়; বরং তাদের ধর্মবিশ্বাস ইসলামের আকীদা বিশ্বাস থেকে এতটাই ভিন্ন যে তারা তাদের এই বিশ্বাস সম্বলিত ধর্মকে একটি স্বতন্ত্র ধর্ম হিসেবেই আখ্যায়িত করে। আর সেই ধর্মের নাম প্রকৃত ইসলাম দাবি করে। পক্ষান্তরে সত্যিকারের মুসলমানদের কাফের এবং আসল ইসলামকে বিকৃত ধর্ম বলে তারা আখ্যায়িত করে।
কাদিয়ানি মতবাদ একটি স্বতন্ত্র ধর্ম: ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ
মির্যা কাদিয়ানির এই বক্তব্যটি লক্ষ্য করুন: ‘তাদের (মুুসলমানদের) ইসলাম ভিন্ন, আমাদের ইসলাম ভিন্ন, তাদের খোদা ভিন্ন আমাদের খোদা ভিন্ন, তাদের নামায ভিন্ন আমাদের নামায ভিন্ন, তাদের হজ্জ ভিন্ন আমাাদের হজ্জ ভিন্ন। এভাবে সবকিছুতেই তাদের সাথে আমাদের ভিন্নতা রয়েছে। (আলফযল কাদিয়ান, ২১ আগস্ট ১৯১৭ ঈ.)
কাদিয়ানিদের উপর্যুক্ত আকীদা ও বক্তব্য থেকে জ্ঞানী ও চিন্তাশীলদের সিদ্ধান্ত হলো কাদিয়ানি মতবাদ সাধারণ কোন ধর্মীয় ফেরকা বা দল নয়; বরং এটি ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ফেৎনা। কেননা, এটি একটি স্বতন্ত্র ধর্ম এবং স্বতন্ত্র ধর্মের প্রতি আহবান। এখানে একটি ধর্মের পুরো অবকাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে। শেয়ার (ধর্মের নিজস্ব প্রতীক) এর বিপরীতে আলাদা শেয়ার, পবিত্র স্থানের বিপরীতে আলাদা পবিত্র স্থান, কেন্দ্রের মোকাবেলায় অন্য কেন্দ্র, কিতাবের বিপরীতে আলাদা কিতাব, ভালোবাসা ও ভক্তি-শ্রদ্ধার স্থানে অন্য ভালোবাসা ও ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং এক চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির স্থানে অন্য চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি। মোটকথা, ইসলামের প্রতিটি বিষয়ের বিকল্প দাঁড় করানো হয়েছে। যার স্পষ্ট অর্থ এই দাঁড়ায়- কাদিয়ানি মতবাদ ইসলামের বিরুদ্ধে একটি প্রকাশ্য বিদ্রোহ এবং ইসলামের নামে স্বতন্ত্র ধর্ম প্রতিষ্ঠার গভীর ষড়যন্ত্র।
ড. আল্লামা ইকবাল রহ. এর বিশ্লেষণ
এ স্থানে আল্লামা ইকবালের বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রণিধানযোগ্য।
তিনি বলেন- ইসলাম একটি ধর্ম, যার সুনির্দিষ্ট একটি পরিচয় রয়েছে। আর তা হলো একক উপাস্যের প্রতি ঈমান, সকল নবী-রাসূলের প্রতি ঈমান এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী ও রাসূল হওয়ার প্রতি ঈমান। এই শেষোক্ত ঈমান ও বিশ্বাসই মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করে এবং এই ফায়সালা প্রদান করে যে, কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠি মুসলিম জাতি হিসাবে গণ্য হবে আর কারা মুসলিম জাতি হিসেবে গণ্য হবে না।
আমার জানা মতে, কোন ইসলামি দল এই পার্থক্যটুকু মুছে ফেলার দুঃসাহস দেখায়নি। ইরানের বাহায়ী সমাজ খতমে নবুওয়তকে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে। কিন্তু সাথে সাথে তারা মেনে নিয়েছে যে, তারা স্বতন্ত্র একটি দল; মুসলমানদের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই।
আমাদের এ ব্যাপারে পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে যে, ইসলাম দ্বীন ও ধর্ম হিসেবে আল্লাহ প্রদত্ত। আর ইসলামের সমাজ ব্যবস্থার রূপায়ণ এবং জীবনধারার বাস্তব চিত্রায়ণ নবী মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহর অনুগ্রহ ও অবদান। আমার দৃষ্টিতে কাদিয়ানিদের জন্য দুটি রাস্তা খোলা আছে। এক. হয়ত বাহায়ীদের অনুসরণ করবে। দুই. অথবা সকল অপব্যাখ্যা ছেড়ে দিয়ে খতমে নবুওয়তের পূর্ণ মর্মসহ তা গ্রহণ করে নিবে। বস্তুত কাদিয়ানিদের সকল বিকৃতি ও অপব্যাখ্যার টার্গেট হল ইসলামের পরিচয় বহন করে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন। (হরফে ইকবাল, পৃষ্টা-১৩৬)
কাদিয়ানিদের সম্পর্কে রাবেতা এবং ও আইসি-র অবস্থান
১. রাবেতাতুল আলম আল ইসলামী
১৯৭৪ ঈ. ১০ ই এপ্রিল মোতাবেক ১৩৯৩ হি. রবিউল আউয়াল মাসে রাবেতার সদর দপ্তর মক্কা মুর্কারমায় ১৪৪ টি ইসলামী সংগঠনের এক আন্তর্জাতিক মহা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়:
ক. কাদিয়ানি মতবাদ যা আহমদিয়া নামেও পরিচিত তারা সম্পূর্ণরূপে ইসলামের গণ্ডি বহির্ভূত।
খ. যারা তাদের মতবাদ গ্রহণ করে তারা অমুসলিম ও ধর্মত্যাগী হিসেবে গণ্য।
গ. কাদিয়ানি মতবাদে বিশ্বাসীদের মুসলিম হওয়ার দাবি কেবলই বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা ও প্রতারণা।
ফিকহ্ একাডেমির এই সম্মেলন ঘোষণা করছে যে, সকল মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান, স্কলার, চিন্তাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট সকলের অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব হল- গোটা বিশ্বে এই ইসলাম বিধ্বংসী মতবাদ ও এর অনুসারীদের প্রতিরোধ করা।
২. ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি)
১৯৮৫ ঈ. ২২ থেকে ২৮ শে ডিসেম্বর, মোতাবেক ১৪০৬ হি. ১০ থেকে ১৬ ই রবিউল আউয়াল পর্যন্ত সৌদি আরবের জেদ্দায় ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি)-র আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমির দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাউথ আফ্রিকার ক্যাপটউন ইসলামিক ফিকহ একাডেমির পক্ষ থেকে একটি ফতওয়া উপস্থাপন করা হয় এবং কাদিয়ানি সম্প্রদায় কি মুসলিম নাকি অমুসলিম এ সম্পর্কে ইসলামি শরীআহ’র সিদ্ধান্ত জানতে চাওয়া হয়। উক্ত সম্মেলনে আলোচনা পর্যালোচনার পর নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়:
‘মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি কতৃক নবুওয়তের দাবি এবং ওহী অবতীর্ণ হওয়ার দাবি ইসলামের সুস্পষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর কোন নবী নেই এবং তার পর আর কোন ওহী অবতীর্ণ হবে না- এর বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য বিদ্রোহ। এ কারণে মির্যা গোলাম আহমদ এবং যারা তার দাবি গ্রহণ করে তারা ধর্মত্যাগী হিসেবে গণ্য। তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে গিয়েছে। একইভাবে লাহোরী কাদিয়ানি সম্প্রদায়ও মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী।’
৩. ওআইসি -র বাগদাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের ধর্ম মন্ত্রী
১৯৮৯ সালে বাগদাদে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়। ঘোষণাপত্রে তখন বাংলাদেশের পক্ষে দস্তখত করেন তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী ও সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী জনাব এম নাজিম উদ্দিন আল আজাদ।
কাদিয়ানিদের সম্পর্কে আদালত ও সংসদের অবস্থান
১. ব্রিটিশ ভারতের ভাওয়ালপুর হাইকোর্টের রায়: ১৯৩৫ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারী ব্রিটিশ শাসনামলে ভাওয়ালপুরের জেলা জজ মুহাম্মদ আকবর সাহেব রায় দিয়েছিলেন যে, কাদিয়ানিরা কাফের এবং ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে। সেই মামলাটি “মুকাদ্দামায়ে ভাওয়ালপুর” হিসাবে পরিচিত। মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল ১৯২৬ সালে। রায় হয়েছিল ১৯৩৫ সালে। দীর্ঘ দশ বছর শুনানির পর প্রায় পৌঁনে দুইশত পৃষ্ঠার এক রায়ে জেলা জজ মুহাম্মদ আকবর সাহেব সিদ্ধান্ত দেন- কাদিয়ানিরা কাফের, ইসলাম তাদের ধর্ম নয়। (মাওলানা মুশতাক আহমদ চিনিঊটি রচিত সদসালা তারিখ, পৃষ্ঠা ৭৭৩-৮০৫)
২. পাকিস্তানের একাধিক উচ্চ আদালতের রায়: ১৯৮১, ১৯৮২, ১৯৮৭, ১৯৯১, ১৯৯২ ঈ. সালে লাহোর হাইকোট, ১৯৮৪, ১৯৯১ ঈ. সালে সম্মিলিত শরয়ী আদলত, ১৯৮৭ ঈ. সালে কোয়েটা হাইকোর্ট, ১৯৮৮ ঈ. সালে সুপ্রিম কোর্ট শরয়ী এপিলেট বেঞ্চ পাকিস্তান এবং ১৯৯৩ ঈ. সালে পাকিস্তান সুপ্রিমকোর্ট কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা করে রায় প্রদান করেছে।
৩. বাংলাদেশ হাইকোর্টের রায়: কাদিয়ানিরা ‘ইসলামেই নবুওয়াত’ নামক একটি বই রচনা করে তাতে কুরআন ও হাদীসের বিকৃত ও মনগড়া অর্থ করে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর নতুন নবীর আগমনের পথ তৈরি করার চেষ্টা করে। বইটি মুসলিম সমাজের আকীদা-বিশ্বাসের মূলে আঘাত হানার কারণে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৫ ঈ. সালের আগস্ট মাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কাদিয়ানিরা সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করে। হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি জনাব সুলতান আহমদ খান ও বিচারপতি জনাব এম. মাহমুদুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে যথোপযুক্ত শুনানির পর কাদিয়ানিদের আবেদন নামঞ্জুর করেন। মাননীয় বিচারপতিগণ তাদের রায়ে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের পরে নবী আবির্ভূত হওয়ার আকীদাকে কুফুরী বিশ্বাস বলে ঘোষণা করেন। সংবাদটি বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৮৬ ঈ. তারিখে প্রকাশিত হয়।
৪. বাংলাদেশ হাইকোর্টের ২য় রায়: ১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে অন্য একটি মামলায় হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মাদ আব্দুল জলিল ও বিচারপতি মোহাম্মাদ ফজলুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে আইনের দৃষ্টিতে কাদিয়ানিদের অমুসলিম বলে রায় প্রদান করেন। এর দ্বারা বাংলাদেশে হাইকোর্টের মতেও কাদিয়ানিরা অমুসলিম ঘোষিত হয়েছে। সরকার কর্তৃক গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটিও কাদিয়ানিদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করার সুপারিশ করেছেন। (তথ্য সূত্র : মো : আব্দুল কাসেম ভূঞা, কাদিয়ানি ধর্মমত বনাম ইসলামী দুনিয়ার অবস্থান) {মাসিক আলকাউসার, ফেব্রুয়ারি ২০১৩}
৫. পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বলী
৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ ঈ. সালে পাকিস্তানের জাতীয় এসেম্বলি সর্বসম্মতিক্রমে কাদিয়ানিদেরকে সংখ্যালঘু অমুসলিম ঘোষণা দেয়। পাকিস্তানের জাতীয় এসেম্বলিতে দীর্ঘ বত্রিশ দিন কাদিয়ানি নেতা ও তাদের তৃতীয় খলীফা মির্যা নাসেরের সাথে শুনানির পর এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তখন পাকিস্তান পিপল্স পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতায় ছিলেন। অতঃপর ১৯৮৪ ঈ. সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের আমলে কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে ইসলামী পরিভাষা ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন পাশ করা হয় এবং আইন অমান্য করলে তার শাস্তির বিধান রেখে দুটি ধারা সংযুক্ত করা হয়।
সংখ্যালঘু ও মুরতাদ
মৌলিকভাবে ইসলামের দৃষ্টিতে কাদিয়ানিরা ধর্মত্যাগী বা মুরতাদ। কেননা তারা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ইসলামের বিপরীতে অসংখ্য কুফুরি মতবাদ আবিষ্কার করে একটি স্বতন্ত্র ধর্মের সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের অপরাধীকে ইসলাম কখনোই বরদাশত করে না। বরং এই অপরাধীদের ব্যাপারে ইসলামের আইনে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে সে আইন বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব ইসলামী হুকুমতের। পক্ষান্তরে গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা করার স্বার্থে দেশের সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু হিসেবে নাগরিকদের অধিকার দেওয়ার প্রচলন রয়েছে।
যৌক্তিক বিচারে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি
কাদিয়ানি সম্প্রদায় যেহেতু ইসলামের মৌলিক আকীদার পরিপন্থী আকীদা পোষণ করে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ নবী স্বীকার করে না; বরং তারা মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানিকে নবী মনে করে এবং তার মতবাদ অনুসরণ করে তাই কোনো আদালত বা পার্লামেন্ট তাদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করুক, আর নাই করুক, তারা সুস্পষ্ট কাফের বা অমুসলিম। এটা ইসলামের ফয়সালা। তবু ইসলামের দুশমন ও ইসলামের জন্য ক্ষতিকর এমন একটি সম্প্রদায়কে মুসলমানের মুখোশ পরে চলার প্রশ্রয় দেওয়া সচেতন মুসলিম সমাজের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তাদেরকে সরকারীভাবে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করে পৃথক একটি ধর্মাবলম্বী দল হিসাবে চিহ্নিত করা এবং ইসলামের পরিভাষাসমূহকে তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করাকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা আবশ্যক। এটাই সচেতন মুসলিম সমাজের ঈমানী চেতনার দাবি।
এদেশীয় মুসলমান হিন্দু বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা যেমন বাংলাদেশের নাগরিক, তেমনি কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের লোকেরাও এ দেশের নাগরিক। দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে সকল ধর্মের অনুসারী লোকেরা যতটুকু নাগরিক অধিকার ও সুবিধা ভোগ করে, কাদিয়ানিরাও ততটুকু পাক, এতে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। তবে সেটা তাদের নিতে হবে নিজের স্বতন্ত্র ধর্মীয় পরিচয়ে; মুসলমান পরিচয়ে নয়। তারা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে ভিন্ন নামে সমাজে বেঁচে থাকুক, আর্থ-সামাজিক কার্যক্রমে তারা তাদের স^তন্ত্র পরিচয় নিয়ে অংশগ্রহণ করুক, তাতেও কোনো মুসলমানের মাথাব্যাথা নেই। তবে মুসলমানের মৌলিক আকীদায় বিশ্বাসী না হয়ে (উল্টো কুঠারাঘাত করে) তারা মুসলমান পরিচয় ধারণ করবে, এ অধিকার তাদের নেই। সুতরাং কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি মুসলিম সম্প্রদায়ের আকীদা রক্ষার আন্দোলন তো অবশ্যই, ধর্মীয় অধিকারের বিষয়ও বটে।
আর যদি সরকারীভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করে তাদেরকে পৃথক একটি ধর্মাবলম্বী দল হিসাবে চিহ্নিত করা না হয়, তাতে মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে বহুবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয় এবং হতে থাকবে। যেমন:
১. তারা মুসলমান পরিচয়ে নিজেদের মতবাদ-মতাদর্শ প্রচার করলে তাতে সাধারণ মুসলমান তাদেরকে মুসলমানেরই একটি দল মনে করে তাদের মতবাদ গ্রহণ করে নিজেদের সবচেয়ে বড় সম্পদ ঈমান হারিয়ে ফেলে।
২. কাদিয়ানিরা তাদের উপাসনালয়কে মসজিদ রূপে তৈরী করে এবং মসজিদ দাবি করে। সাধারণ মুসলমান তাদের উপসনালয়কে মসজিদ মনে করে সেখানে গিয়ে নামায পড়লে মুসলমানদের কাছে ঈমানের পরে সর্বোচ্চ যে ইবাদত নামায, তা নষ্ট হয়।
৩. কাদিয়ানি ধর্মমতের অনুসারী কোনো ব্যক্তি মুসলমানের ইমাম সেজে তাদের ঈমান-আমল নষ্ট করতে পারে।
৪. তাদের রচিত ও প্রকাশিত বইপত্রকে মুসলমানদের লেখা বই-পুস্তকের মত মনে করে পাঠ করে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং ঈমান হারিয়ে বসে।
৫. তারা মুসলমান নামে পরিচিত হওয়ার কারণে সাধারণ মুসলমানরা তাদের সাথে মুসলনামানের মত আচার-আচরণ ও চলাফেরা করে। অথচ তাদের সাথে মুসলমানের সম্পর্ক সাধারণ অমুসলিমদের মত হওয়া উচিত।
৬. অনেক সাধারণ মুসলমান তাদেরকে মুসলমান মনে করে নিজেদের বিবাহের উপযুক্তা মেয়েদের কাদিয়ানি ছেলের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে অমুসলিমদের হাতে নিজেদের কন্যা তুলে দেয় এবং মুসলিম পাত্রের জন্য কাদিয়ানি ধর্মাবলম্বী লোকের মেয়েকে মুসলমান না করে বধু হিসেবে বরণ করে। ফলে এরূপ দম্পতি আজীবন ব্যভিচারের গুনাহে লিপ্ত থাকে।
৭. যে কোনো কাফের তথা অমুসলিমের জন্য হারাম শরীফে (মক্কা মদীনায়) ঢোকা নিষেধ। অথচ কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের লোকেরা মুসলিম পরিচয় দিয়ে হজ্ব ও চাকরি-বাকরির নামে সৌদি আরবে গিয়ে হারাম শরীফে প্রবেশ করে তার পবিত্রতা নষ্ট করার সুযোগ পায়।
৮. কোনো সম্পদশালী মুসলমান কোনো কাদিয়ানি ধর্মাবলম্বী গরীবকে যাকাত দিলে তার ফরয যাকাত আদায় হয় না।
এ বিষয়টি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, এমন একটি সম্প্রদায় যারা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে অমুসলিম, সুতরাং কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে মুসলমান থেকে পৃথক একটি ধর্মের অনুসারী দল ঘোষণা করে ভিন্ন নামে চিহ্নিত না করা হলে এরূপ বহু সমস্যা সৃষ্টি হয়, হতে পারে এবং ভবিষ্যতে হতে থাকবে। এতে মুসলমান সমাজের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার কারণে তারা যদি উত্তেজিত হয়ে উঠে, তবে এতে দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে এবং মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে, যা কারও কাম্য নয়। কাজেই তাদেরকে অবিলম্বে পৃথক একটি ধর্মাবলম্বী দল ঘোষণা করে পৃথক নামে তাদেরকে একটি সংখ্যালঘু দল হিসাবে মর্যাদা দিলে এবং তাদের জন্য ইসলামী পরিভাষাসমূহ যেমন: নামায, রোযা, মসজিদ, হজ্ব ইত্যাদির ব্যবহার নিষিদ্ধ করলে তা দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পক্ষে সহায়ক হবে বলে আমরা মনে করি। এটাই সচেতন মুসলিম সমাজের ঈমানী চেতনা ও প্রাণের দাবি।
সরকারের প্রতি আহ্বান
সুতরাং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাছে দেশের সংখ্যাগুরু নাগরিকদের জোর দাবি হল- মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতসমূহের রায় এবং আন্তর্জাতিক সর্বোচ্চ ইসলামী সংস্থা ওআইসি’র সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ওআইসি’র সদস্যদেশ হিসাবে বাংলাদেশ সরকারেরও উচিত অবিলম্বে কাদিয়ানিদেরকে সরকারীভাবে ‘সংখ্যালঘু অমুসলিম’ ঘোষণা করা এবং তাদের জন্য ইসলামী পরিভাষাসমূহের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা।
আল্লাহ তাআলা সকলের কল্যাণের ফয়সালা করুন! আমীন।
দুআর ভিখারী
শুয়াইব ইবরাহীম
আমির- ইন্টারন্যাশনাল খতমে নবুওয়ত মুভমেন্ট, বাংলাদেশ